
এইটি একটি বিস্ময়কর ও রহস্যময় সংবাদ: যুক্তরাজ্যের একটি জাদুঘরের সংগ্রহে মানুষের চামড়া দিয়ে বাঁধানো একটি বই পাওয়া গেছে, যা ইতিহাস, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্যে নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। এই ঘটনা শুধু একটি অদ্ভুত খোঁজ নয়, বরং শতাব্দী প্রাচীন কল্পকাহিনীর মতো কাহিনি, বাস্তব খুন এবং অদ্ভুত সংগ্রহশালার ইতিহাসকে একত্র করে। নিচে বিস্তারিতভাবে সেই রহস্যময় ঘটনার পেছনের পটভূমি, প্রেক্ষাপট, ঐতিহাসিক ঘটনা, সমালোচনা এবং এর নৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরা হলো
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডের সাফোক কাউন্টির বুরি সেন্ট এডমন্ডস-এ অবস্থিত Moyse’s Hall Museum-র কর্মীদের কাছে একটি অদ্ভুত বই পাওয়া গেছে, যেটি তৈরি হয়েছিল মানুষের চামড়ায় বাঁধানো হিসেবে।
এই বইটি ছিল একটি ঐতিহাসিক কাহিনি বা মামলার বিবরণ সহ একটি টেক্সট, এবং ধারণা করা হচ্ছে যে এটি বানানো হয়েছিল উইলিয়াম কর্ডার নামক একজন কুখ্যাত ১৯শ শতকের খুনির চামড়ায় বাঁধাই করে।
তবে এই খুঁজে পাওয়া বইটির কিছু অংশে মানুষের চামড়া মাত্র স্পাইন ও কর্নার(পৃষ্ঠার কোণা)-তে ব্যবহৃত হয়েছে, পুরোটাই নয়, যেটি তার আগের খোঁজ পাওয়া আরেকটি বইয়ের তুলনায় পৃথক।
পেছনের ইতিহাস: উইলিয়াম কর্ডার এবং “Red Barn Murder”
এই বইটির পেছনে রয়েছে এক দুঃসাহসিক খুনের কাহিনি — অ্যাঙ্গ্লিয়া অঞ্চলের Red Barn Murder নামে পরিচিত কাহিনি। ১৮২৭ সালে উইলিয়াম কর্ডার তার প্রেমিকা মারিয়া মার্টেনকে পোলস্টেডের রেড বার্ন গুদামে হত্যা করেন এবং পরে তিনি বিচার শেষে ফাঁসি পায়।
তার মৃত্যুর পর তার দেহ উদ্ধার ও শুদ্ধিকরণে অংশ নেওয়া সার্জন জর্জ ক্রিড তার ত্বকটি ট্যান করে একটি বইয়ের আবরণের জন্য ব্যবহার করেছিলেন, যেটি হত্যাকান্ড এবং বিচার সম্পর্কে লেখা একটি বই ছিল।
এই বইটি museum-এ প্রথমবার প্রদর্শিত হয় ১৯৩৩ সালে এবং এটি বহু বছর ধরে সংগ্রহে ছিল, তবে সম্প্রতি আরও একটি অনুপস্থিত বই আবিষ্কৃত হয়েছে যেটা প্রায় ২০ বছর ধরে কোথাও ভুলে রাখা ছিল।
বই তার বিশেষত্ব ও মূল্য
এই ধরনের বইকে ইতিহাসের ভাষায় বলা হয় Anthropodermic Bibliopegy — মানুষের চামড়ায় বই বাঁধার প্রক্রিয়া। যদিও এটি আজকাল খুব বিরল ও অদ্ভুত, তবে ১৮শ ও ১৯শ শতকে এটি কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে ঘটেছে।
বিশেষতঃ এই বইটি একটি নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বর্ণনা রাখে, ফলে এটি শুধু একটি বস্তু নয়, এক ধরণের ঐতিহাসিক সাক্ষ্যও বটে।
নৈতিক বিরোধ ও সমালোচনা
এ ধরণের বই প্রদর্শিত হওয়া নিয়ে বহু মানুষ নৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষতঃ মানুষের দেহের অংশ কখনোই সম্মতি ব্যতীত ব্যবহার করা উচিত নয় এমন যুক্তি প্রবল। যেমনটি অন্য ক্ষেত্রে দেখা গেছে — হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তার ১৮৮০ দশকের একটি বই থেকে মানব চামড়ার আবরণ সরিয়ে ফেলেছে, কারণ এটি সহমত ছাড়া নেওয়া হয়েছিল এবং এটি নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে বিচার করা হয়েছে।
আপনারা যদি এই ধরণের বইকে কেবল বিস্ময়ের বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে মনে রাখতে হবে যে এটি ইতিহাসের একটি বিচিত্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা মানবাধিকার, সম্মতি এবং নৈতিক সংগ্রহশালা নীতি নিয়ে আলোচনার দরজা খুলে দেয়।
বিতর্কিত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বব্যাপী ইতিহাসে অনেকে এই ধরনের বই বানিয়েছেন — যেমন আমেরিকার কিছু পুরাতন গ্রন্থাগারে ধারণা করা হয়েছে যে ১৮০০ ও ১৯০০ দশকের কিছু বই মানুষ বা প্রাণীর চামড়ায় বাঁধা হয়েছিল।
তবে আধুনিক সময়ে যখন ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা ও দর্শকরা বই-পুস্তক সংগ্রহ করেন, তখন মানব দেহের অংশকে গবেষণা ও প্রদর্শনের আগে নৈতিক অনুমতি এবং আইনি অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।
এই ঘটনাটি আমাদের কাছে কী বার্তা দেয়?
এই বইটি কেবল একটি বিরল মৃত্যু-স্মৃতি নয়; এটি মানব ইতিহাসের অদ্ভুত, অন্ধকার এবং বিতর্কিত মাত্রা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। কিছু প্রশ্নগুলো হলো:
- কীভাবে সমাজ ইতিহাস এবং নৃশংস ঘটনাকে সংরক্ষণ করে?
- কোনো ঐতিহাসিক বস্তু মানবাধিকার ও সম্মানকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে?
- নৈতিকতা ও সম্মতির সীমা কোথায়?
এই ধরনের আলোচনা শুধু ইতিহাস-প্রেমীদের জন্যই নয়, বরং সমাজ, নৈতিক দর্শন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের Moyse’s Hall Museum-তে মানুষের চামড়ায় বাঁধানো বইয়ের সন্ধান একটি ঐতিহাসিক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা শুধু ঘটনা সংরক্ষণ করা নয়, বরং মানব মর্যাদা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সম্মতির বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া।
তাই এই খোঁজ কেবল রহস্য নয় — এটি একটি উত্তেজনাপূর্ণ ইতিহাস-চিন্তার ক্ষেত্র যেখানে আমরা অতীতের অন্ধকার কোণগুলোকে আলো দিয়ে দেখি এবং ভবিষ্যতের নৈতিক বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করি।
#খবরডটকম
0 মন্তব্যসমূহ