
নয়াদিল্লি/ওয়াশিংটন: ২০২৬ সালের প্রবেশের সাথে সঙ্গে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একটি নতুন মোড়ে পৌঁছেছে। বহুদিনের বাণিজ্য-ট্যারিফ উত্তেজনা, সীমান্তিক রাজনৈতিক চাপ এবং কৌশলগত সমন্বয়ের পর, দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি (interim trade framework) ঘোষণা করেছে; যার কেন্দ্রে রয়েছে আমেরিকান উড়োজাহাজ ও বিমান শিল্পের বড় অর্ডার, শুল্ক হ্রাস, এবং পরস্পরের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সুযোগ।
চুক্তির আলোকে বোয়িংসহ অন্যান্য মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারীর সাথে সম্পূর্ণ অর্ডারবুক ও উৎপাদন-সরবরাহ সম্পর্ক গভীর করার পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই আলোচ্য রয়েছে। বিশেষত ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমানের উড়োজাহাজ ও বিমানাংশসহ আনুমানিক ৭০–৮০ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার আশা করা হচ্ছে, যা ভারতীয় বাণিজ্য ও বিমানশিল্পে ক্রান্তিকালের প্রবৃদ্ধি রূপ দিতে পারে।
ট্যারিফ ও শুল্ক পরিবর্তন: সহযোগিতার নতুন ইঙ্গিত
চুক্তির অন্যতম মূল দিক হল ট্যারিফ ও শুল্কের কাঠামোতে পরিবর্তন। পূর্বে ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক উত্তেজনায় ছিল; বিশেষত বিমান ও বিমানাংশে। চুক্তির ফলে উল্লেখযোগ্য শুল্ক কমিয়ে ১৮% এ নেয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে শুল্কশূন্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা উড়োজাহাজ, এয়ারক্রাফট ইঞ্জিন, এবং বিমানাংশের বাণিজ্যকে নতুন গতিশীলতা দেবে।
এটি ভারতীয় এয়ারক্রাফট নির্মাণ ও উপাদান সরবরাহকারী শিল্পগুলিকে শুধু আমদানি-নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব ও সম্ভাব্য রপ্তানি-মার্কেটকে বৃদ্ধি করবে।
অর্থনৈতিক সংযোগের পাশাপাশি কৌশলগত সম্পর্ক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র শুধুই বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করছে না; কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও মূল অগ্রাধিকার। এক দশকের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামোতে স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে আমেরিকান সামরিক প্রযুক্তি, বিমানসহ নৌঘাঁটির সরঞ্জামে ভারত আগ্রহী হয়েছে এবং এতে বহু ধরনের সামরিক বাহিনী-ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কও বিস্তৃত হচ্ছে।
এছাড়া বাণিজ্য চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা মানে কেবল অর্থনৈতিক মুনাফা নয়—এটি ক্ষেত্রভিত্তিক নিরাপত্তা, তথ্য-প্রযুক্তি, বিমান ও মহাকাশ গবেষণা-তে আরও সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
এ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু অর্থনীতি নয়; এটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। গত কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে মার্কিন দিকনির্দেশিত নীতি ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। যদিও কিছু সময়ে বাণিজ্য ট্যারিফ এবং শুল্ক ইস্যু দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি করেছিল, নতুন চুক্তির মাধ্যমে এটি অনেকটাই সমাধান হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতোমধ্যেই মন্তব্য করেছেন যে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আজকের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে; এটি শুধু বাণিজ্য বা কৌশল নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের অংশ।
উড়োজাহাজ কেনা: অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
উড়োজাহাজ কেনা তথা শিল্প ও সরবরাহ-চেইন সম্পর্ক উন্নয়ন কেবল বড় অর্ডার নয়; এতে রয়েছে অর্থনৈতিক কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত জ্ঞান স্থানান্তর, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রস্তুতকারক অবস্থান বৃদ্ধি। উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক ও অংশ-সরবরাহকারী খাতে ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য এটি একটি বিরাট প্রবৃদ্ধির সুযোগ।
বিশেষ করে বিমান উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে স্থানীয় কর্মী ও প্রযুক্তিবিদদের মান বাড়াতে সহায়তা করে, এটি দীর্ঘমেয়াদে চাকরি সৃষ্টি এবং দক্ষতার উন্নয়নকে উৎসাহিত করবে। এর ফলে ভারতীয় অর্থনীতি শুধুমাত্র আমদানি-নির্ভর নয়, বরং একটি সহযোগী রপ্তানিকেন্দ্র-এ রূপান্তরিত হতে পারে।
সরকারি এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ উদ্যোগকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও মজবুত করে তুলতে “দারুণ খবর” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন এটি শুধু বাণিজ্য নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীরীকরণে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।
তবে রাজনৈতিক বিরোধিতাও রয়েছে। কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা জয়রাম রমেশ যৌথ বিবৃতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের অভাবের জন্য প্রশ্ন তুলেছেন, যা আরও স্বচ্ছতার দাবি করে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
এই বাণিজ্য ও উড়োজাহাজ-চুক্তি শুধু সাম্প্রতিক উন্নয়ন নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক ডিপ্লোম্যাসি ও অর্থনৈতিক কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মার্কিন শিল্প ও ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক গতানুগতিক সমস্যা কাটিয়ে উঠলে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর বাজারে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রসার ঘটাতে পারে।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক মহলে চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের কর্মধারা ও কৌশলগত সদিচ্ছা আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিকে পুনরায় নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
#উড়োজাহাজ_চুক্তি #বাণিজ্য_চুক্তি #ভারত #যুক্তরাষ্ট্র ##খবরডটকম
0 মন্তব্যসমূহ