
দক্ষিণ এশিয়ার সংঘর্ষে বড় সামরিক ক্ষতির ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প
সংযুক্ত রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সামরিক সংঘাতে নিজ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে একটি বিস্তৃত দাবি করেছেন, যেখানে তিনি বলেন ২০২৫ সালের মে মাসে এই সংঘাতে মোট ১০টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল এবং এতে তিনি “পাশ্চাত্যের কূটনৈতিক চাপ ও শুল্ক হুমকি” দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে পরিস্থিতি থামিয়েছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যটি বেশ অনন্য ও বিতর্কিত—এতে তিনি কেবল যুদ্ধবিমান ক্ষতি হিসাব তুলে ধরেননি, সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে এটি একটি বড় আকারের সংঘাতে পরিণত হতে পারত এবং পারমাণবিক যুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারত, যদি না তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি কার্যকর করতেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে তিনি নিম্নলিখিত মূল পয়েন্টগুলো উপস্থাপন করেছেন:
যুদ্ধবিমান ভূপাতিত:
ট্রাম্প বলেন, “ভারত ও পাকিস্তান খুব তীব্রভাবে সংঘাতে ছিল; ১০টি বিমান গুলি করে ভূপাতিত হয়েছিল এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হবার উপক্রম ছিল।” তিনি এই তথ্য Fox Business-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেন।
পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা:
ট্রাম্প দাবি করেন, তার মতে ওই সংঘাত পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারত, যদি না তিনি শুল্কের হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি থামাতেন। তিনি বলেন, ভারত ও পাকিস্তান “খুব তীব্রভাবে লড়াই করছিল” এবং “বিনা শুল্কে এটা থামানো যেত না।”
শুল্ক ও কূটনৈতিক চাপ:
ট্রাম্পের বক্তব্যের কেন্দ্রীয় অংশ ছিল যে, তিনি উভয় দেশের কাছে ট্রেড শুল্কের হুমকি দিয়েছিলেন যাতে করে তারা যুদ্ধ থামায়। তাঁর দাবি, তিনি বলেছেন, “যদি তোমরা এই যুদ্ধ থামাতে না পারো, তাহলে আমি শুল্ক আরোপ করবো।”
নিজ ভূমিকার পুনরাবৃত্তি:
ট্রাম্প আরও বলেছেন যে, গত বছরের মে মাসে তিনি এই সংঘাতে মধ্যস্থতা করে একটি পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছিলেন এবং সে থেকে তিনি প্রায় ৮০ বার নিজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।
সংঘাতের পটভূমি
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা মূলত ২০২৫ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি একটি ভয়াবহ ঘটনার পর তীব্র হয়। ভারতের কাশ্মীরের পেহেলগাম হামলার পরে ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে, যা পাকিস্তান খন্ডভাবে অস্বীকার করে। এরপর দুই পাশের মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত উত্তেজনা ও লড়ে সাম্প্রতিক সংঘাতে পরিণত হয়।
ভারত তখন “অপারেশন সিন্ডুর” নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে, যা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী অবকাঠামোতে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল। এরপর দু’দেশের বিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক শক্তি দিয়ে বিনিময় হয় যা কয়েকদিন পর্যন্ত চলেছে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের মে ১০ তারিখে ভারতের নতুন শুল্কের হুমকি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, যা সংঘর্ষকে কয়েকদিনের মধ্যে থামায়।
ট্রাম্পের দাবি ও বাস্তবতা: বিশ্লেষণ
ট্রাম্পের এই নতুন দাবিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওঠে আসে:
১. নম্বর বার বার পরিবর্তিত:
ট্রাম্প শুরুতে দাবি করেছিলেন যে সংঘাতে ৫টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে, পরে তা বাড়িয়ে ৭টি, ৮টি এবং এবার ১০টি হয়ে গেছে। এর ফলে তাঁর বক্তব্যে সংখ্যার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২. কোন দেশের বিমান ভূপাতিত হয়েছিল?
ট্রাম্প স্পষ্ট করেননি কোন দেশের বিমানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বা কোন এক পক্ষের জন্য উন্নয়ন ঘটেছিল—এটি তিনি ব্যক্তিগত ধারনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
৩. ভারতের অবস্থান:
ভারত সরকার নিয়মিতভাবে বিরোধী দাবি করে এসেছে যে কোনো তৃতীয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি বা সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেনি এবং পাকিস্তান–ভারত সমস্যা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধান করা হয়েছে।
৪. সাম্প্রতিক বিরোধী মতামত:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ট্রাম্পের বক্তব্য ও পরিসংখ্যানগুলো রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে, যেখানে তিনি নিজের নীতি ও আন্তর্জাতিক ভূমিকার স্বীকৃতি দাবি করছেন—যা নিজ দেশের ভেতরে সমর্থন বৃদ্ধির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। এই ধরণের কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের মধ্যে প্রায়ই মিল থাকে না।
বিরতি ও প্রভাব
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, পারমাণবিক সংঘাতে রূপ নিলে তা শুধু ভারত ও পাকিস্তানের জন্যই বিপজ্জনক হতো না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য তা বড় নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতো।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন ধরণের সংঘাতের প্রভাবকে শুধু সামরিকভাবে দেখা ঠিক নয়; এর আর্থিক ও রাজনৈতিক falloutও রয়েছে—যেমন বাণিজ্য, অর্থনীতি, পুঁজিবাজার, জ্বালানি সরবরাহ, এবং উপমহাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও পরিস্থিতি
ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে:
পাকিস্তান ও ভারতের প্রতিক্রিয়া: দুই দেশের সরকারই প্রত্যেক নিজস্ব নীতিতে থাকে; ভারত বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে বাণিজ্য চাপ বা অন্য কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের দাবি।
বিশ্ব শক্তির দৃষ্টিভঙ্গি: যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া সহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশ সমূহ এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সচেষ্ট; এমন কোনো দাবি বা বিবৃতি বড় পরিসরে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট: শঙ্কা রয়েছে, দুর্বল ও মধ্যস্থস্থ দেশগুলো এই সংঘাতের প্রভাব থেকে নিজেদের অর্থনীতি ও রাজনীতি রক্ষার জন্য সংযত অবস্থান নেয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবিতে ভারত ও পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে পুনরায় একটি আন্তর্জাতিক আলোচনার সূচনা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন ১০টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয় এবং যুদ্ধ পারমাণবিক পর্যায়ে যেতে পারত, যদি না তিনি শুল্ক চাপ প্রয়োগ করে পরিস্থিতি থামানোর উদ্যোগ নিতেন।
তবে এই দাবি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা কঠিন—সংখ্যা ও বাস্তব সামরিক ক্ষতির তথ্য, কঠোর তৃতীয়-পক্ষ বিশ্লেষণ এবং দু’পক্ষের সরকারী মন্তব্যের ভিত্তিতে এই দাবির যথার্থতা বিবেচনা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ধরনের বক্তব্যগুলো সাধারণত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, কূটনৈতিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ সমর্থন বৃদ্ধির জন্যও ব্যবহৃত হয়।
এক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই নিজেদের অবস্থান দৃঢ় রেখে আসছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় সংঘাত সমাধানকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
#বিশ্ব #খবরডটকম #khabardtkom
0 মন্তব্যসমূহ