একুশে পদকের ঘোষণা, কনসার্টের তালে খুশি ‘ওয়ারফেজ’-এর সদস্যদের


ঢাকা: দেশের ব্যান্ড মিউজিক জগতের এক আইকনিক দল, ওয়ারফেজ, এবার রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পেতে যাচ্ছে। খবরটি এসেছে এমন সময়ে, যখন ব্যান্ডটি তাদের ২০২৬ সালের কনসার্টের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ব্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি তাদের জন্য এক অপার আনন্দের মুহূর্ত।

বাংলাদেশের রক সংগীতের পথিকৃৎ

ওয়ারফেজ ব্যান্ড ১৯৮০-এর দশকে গড়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের হেভি মেটাল ও রক মিউজিকের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু করে। এই ব্যান্ডের গানগুলো কেবল জনপ্রিয় নয়, বরং বাংলাদেশের যুবসমাজকে এক নতুন সঙ্গীতধারা উপহার দিয়েছে। তাদের গানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত অনুভূতির সমন্বয় আছে, যা শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে।

ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও গিটারিস্ট শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, "ওয়ারফেজ কখনও শুধু একটি ব্যান্ড ছিল না, এটা ছিল একটি আন্দোলনের অংশ। আমাদের গানগুলো সবসময় আমাদের সময়ের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন করেছে।"

ওয়ারফেজ-এর জনপ্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মহাকাশের গান’, ‘বিপ্লবী সুর’ এবং ‘চোখের দেখা’। এই গানগুলো শুধু শ্রোতাদের মধ্যে নয়, বরং সমসাময়িক সঙ্গীতজ্ঞ ও সমালোচকদের মধ্যেও প্রশংসিত হয়েছে।

একুশে পদক: কী এবং কেন?

‘একুশে পদক’ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতে ১৯৭৬ সালে এই পদক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পদক দেওয়া হয় বিশেষ অবদান রাখায় — ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে।

ওয়ারফেজ-এর একুশে পদক প্রাপ্তি ব্যান্ড মিউজিককে নতুন মর্যাদা দিচ্ছে। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যান্ডকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলো, যা আগে সাধারণত ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক ছিল।

ব্যান্ডের সংগ্রাম ও সাফল্য

ওয়ারফেজ-এর যাত্রা সহজ ছিল না। ১৯৮০-এর দশকে রক মিউজিক বাংলাদেশের মঞ্চে নতুন ধারা ছিল, এবং তখন এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছিল। প্রথম অ্যালবাম ওয়ারফেজ ১৯৮৫ মুক্তি পেলে দেশজুড়ে ব্যান্ডের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যান্ডের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো তাদের লাইভ কনসার্টগুলো, যেখানে তারা শুধু নতুন গানই পরিবেশন করত না, বরং সমাজে সচেতনতা ও সংস্কৃতির প্রসারে ভূমিকা রাখত। এটি ছিল তাদের সঙ্গীতের মূল লক্ষ্য — বিনোদন নয়, বরং সমাজকে ভাবাতে উৎসাহিত করা।

ব্যান্ডের বর্তমান সদস্যরা মনে করেন, এই দীর্ঘকালীন যাত্রা এবং সমাজে প্রভাব তৈরি করায় রাষ্ট্র এবার তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, "এই পদক কেবল আমাদের জন্য নয়, এটি আমাদের সমস্ত শ্রোতা, সমর্থক এবং বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের জন্য।"

সাংস্কৃতিক প্রভাব

ওয়ারফেজ শুধুমাত্র গান গাইছে না; এটি একটি পুরো সঙ্গীত আন্দোলন। তাদের গানগুলো সামাজিক সচেতনতা, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার সম্পর্কিত বার্তা বহন করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের গানের প্রতি শ্রোতাদের আনুগত্য বৃদ্ধি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যান্ডের এই স্বীকৃতি নতুন প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীদের অনুপ্রেরণা দেবে। এটি দেখায় যে, শুধু জনপ্রিয়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক অবদানকেই রাষ্ট্র মূল্যায়ন করছে।

কনসার্টের প্রস্তুতি ও আনন্দের মুহূর্ত

ওয়ারফেজ-এর ২০২৬ সালের কনসার্টের জন্য প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক তখনই খবরটি আসে যে তারা একুশে পদক পাচ্ছে। ব্যান্ডের সদস্যরা জানান, "আমরা আনন্দে অভিভূত। এটি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।"

এই কনসার্টে তারা নতুন অ্যালবাম এবং পুরনো প্রিয় গানগুলো পরিবেশন করবেন। পদকপ্রাপ্তির খবর কনসার্টের উত্তেজনা আরও দ্বিগুণ করেছে।

সংগীত সমালোচক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়ারফেজ-এর স্বীকৃতি শুধু ব্যান্ডের জন্য নয়, বরং পুরো ব্যান্ড মিউজিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি মর্যাদা। এটি দেখায় যে সরকারও নতুন ও সমসাময়িক শিল্পকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

একুশে পদক প্রাপ্তির ফলে ব্যান্ডের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে। এটি যুবসমাজকে দেখাবে যে কঠোর পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক অবদান সর্বদা স্বীকৃত হতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের অন্যতম পথিকৃৎ ওয়ারফেজ-এর একুশে পদক প্রাপ্তি শুধু একটি স্বীকৃতি নয়, এটি একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। এটি দেখায় যে দেশের ব্যান্ড মিউজিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পৌঁছেছে।

ওয়ারফেজ-এর এই অর্জন ভবিষ্যতে আরও নতুন সঙ্গীত উদ্যোগ এবং শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করবে। কনসার্টের আনন্দের সঙ্গে মিলিত এই সুখবর তাদের জন্য একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

 #খবরডটকম


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ