.jpg)
শীত এলেই ত্বক নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা শুরু হয়। ঠান্ডা হাওয়া, কম আর্দ্রতা, কুয়াশা আর গরম পানিতে গোসল—সব মিলিয়ে শীতে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই ত্বক বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলেন, শীতে সুস্থ ত্বক মানেই সুন্দর ত্বক। এই কথাটির পেছনে শুধু সৌন্দর্যচর্চার দর্শন নয়, রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও। ত্বক সুস্থ থাকলেই তার উজ্জ্বলতা, কোমলতা ও তারুণ্য বজায় থাকে—যা সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি।
শীতে ত্বকের প্রকৃত পরিবর্তন কীভাবে হয়
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়। ফলে ত্বক দ্রুত পানি হারায় এবং শুষ্ক হয়ে ওঠে। ত্বকের ওপরের স্তর বা স্কিন ব্যারিয়ার দুর্বল হলে চামড়া খসখসে হয়, চুলকানি দেখা দেয়, এমনকি ফাটলও ধরতে পারে। এই অবস্থায় ত্বক যদি নিয়মিত আর্দ্রতা ও পুষ্টি না পায়, তবে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে নিষ্প্রাণ দেখাতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে ত্বকের তেলগ্রন্থি স্বাভাবিকের তুলনায় কম সক্রিয় থাকে। ফলে ত্বকের নিজস্ব তেল কম তৈরি হয়, যা ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষা দেয়। এই ঘাটতি পূরণ না হলে ত্বক শুধু শুষ্কই নয়, বরং সংবেদনশীলও হয়ে ওঠে।
সুস্থ ত্বক কেন সুন্দর ত্বক
সুস্থ ত্বকের বৈশিষ্ট্য হলো—সমান রং, পর্যাপ্ত আর্দ্রতা, মসৃণতা ও স্থিতিস্থাপকতা। শীতে এই চারটি বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। ত্বক যখন ভেতর থেকে আর্দ্র থাকে, তখন বলিরেখা কম চোখে পড়ে, মুখে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা থাকে এবং মেকআপ ছাড়াও ত্বক প্রাণবন্ত দেখায়।
অন্যদিকে, শুষ্ক ও ক্ষতিগ্রস্ত ত্বকে সহজেই দাগ, ফাইন লাইন বা অকাল বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা দেয়। তাই বাহ্যিক সৌন্দর্যের আগে ত্বকের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। ত্বক সুস্থ থাকলে আলাদা করে অতিরিক্ত সাজসজ্জার প্রয়োজন পড়ে না—এটাই ‘সুন্দর ত্বক’-এর প্রকৃত সংজ্ঞা।
শীতে ত্বকের রোগ ও সমস্যার ঝুঁকি
শীতকালে একজিমা, সোরিয়াসিস, ডার্মাটাইটিসের মতো ত্বকের সমস্যাগুলো বেশি বাড়তে দেখা যায়। শুষ্কতা ও ঠান্ডা বাতাস এসব সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। যাদের আগে থেকেই ত্বক সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে শীতকাল আরও সতর্কতার দাবি রাখে।
এ ছাড়া ঠোঁট ফাটা, হাত-পা রুক্ষ হওয়া, চোখের চারপাশে ডার্ক সার্কেল বা ত্বক টানটান লাগার মতো সমস্যাও শীতে বেশি দেখা যায়। এসব লক্ষণ আসলে ত্বকের ভেতরের পানিশূন্যতার ইঙ্গিত দেয়।
শীতে ত্বক সুস্থ রাখার মূল কৌশল
শীতে ত্বক সুস্থ রাখার প্রথম শর্ত হলো—আর্দ্রতা ধরে রাখা। গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বকের ভেতরের পানি আটকে রাখা সহজ হয়। হালকা লোশন নয়, বরং শীতের জন্য উপযোগী ঘন ময়েশ্চারাইজার ত্বকের সুরক্ষায় বেশি কার্যকর।
পর্যাপ্ত পানি পান করাও অত্যন্ত জরুরি। শীতে তৃষ্ণা কম লাগলেও শরীরের পানির চাহিদা কমে না। ভেতর থেকে আর্দ্রতা না পেলে বাহ্যিক যত্নও পুরোপুরি কাজ করে না।
খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা
ত্বকের সৌন্দর্য অনেকটাই নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাসের ওপর। শীতে ভিটামিন এ, সি ও ই সমৃদ্ধ খাবার ত্বকের জন্য উপকারী। গাজর, কমলা, লেবু, শাকসবজি ও বাদাম ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে। ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার ত্বকের শুষ্কতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
চর্বিযুক্ত ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তাই শীতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাই ত্বক সুস্থ রাখার অন্যতম চাবিকাঠি।
সূর্যরশ্মি ও শীতকাল
অনেকে মনে করেন, শীতে সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব কম। বাস্তবে তা পুরোপুরি সত্য নয়। শীতকালেও অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। তাই শীতেও নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার ত্বকের বার্ধক্য প্রতিরোধে সহায়ক।
মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব
ত্বকের স্বাস্থ্য শুধু বাহ্যিক যত্নেই সীমাবদ্ধ নয়; মানসিক চাপও ত্বকের ওপর প্রভাব ফেলে। শীতে দিনের আলো কমে যাওয়ায় অনেকের মধ্যে বিষণ্নতা বা মানসিক ক্লান্তি দেখা দেয়, যা ত্বকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম, হালকা ব্যায়াম ও মানসিক প্রশান্তি ত্বক সুস্থ রাখার সহায়ক উপাদান।
কেন শীতেই সৌন্দর্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শীতে ত্বকের যত্ন ঠিকভাবে নিলে সারা বছরের জন্য ত্বকের ভিত্তি শক্ত হয়। এই সময়ে ত্বককে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও সুরক্ষা দিলে গ্রীষ্মের অতিরিক্ত তাপ ও ঘামেও ত্বক তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে। তাই শীতকালকে ত্বক পুনরুদ্ধারের আদর্শ সময় বলা হয়।
শীতে ত্বক শুধু শুষ্ক হয়ে যায়—এমন ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। বরং শীত হলো ত্বকের প্রকৃত যত্ন নেওয়ার সেরা সময়। সুস্থ ত্বকই যে সুন্দর ত্বকের মূল শর্ত—এই সত্যটি শীতকালে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সঠিক যত্ন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সচেতন অভ্যাসের মাধ্যমে শীতেও ত্বক রাখা যায় উজ্জ্বল, মসৃণ ও প্রাণবন্ত। আর তখনই প্রবাদটি বাস্তবে রূপ নেয়—শীতে সুস্থ ত্বক মানেই সুন্দর ত্বক।
0 মন্তব্যসমূহ