
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের যুগে আরেকটি বড় মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশের আর্থিক খাত। দেশের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence–AI) চালিত ভার্চুয়াল ব্যাংকিং রিলেশনশিপ ম্যানেজার ‘মিতা’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ গ্রাহকসেবাকে আরও দ্রুত, স্মার্ট ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করার পথে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই এমটিবি এই এআই-ভিত্তিক ভার্চুয়াল রিলেশনশিপ ম্যানেজার চালু করেছে। ‘মিতা’ মূলত একটি বুদ্ধিমান ডিজিটাল সহকারী, যা ২৪ ঘণ্টা গ্রাহকদের বিভিন্ন ব্যাংকিং তথ্য, পণ্য ও সেবা সম্পর্কে সহায়তা দিতে সক্ষম।
কী এই ‘মিতা’
‘মিতা’ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি একটি ভার্চুয়াল ব্যাংকিং রিলেশনশিপ ম্যানেজার। এটি মানুষের মতো কথোপকথনের মাধ্যমে গ্রাহকের প্রশ্ন বুঝতে পারে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সঠিক তথ্য সরবরাহ করে। এমটিবির বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত এই সিস্টেম গ্রাহকদের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত করে তুলবে।
গ্রাহকরা এখন আর শুধুমাত্র শাখা বা কল সেন্টারের ওপর নির্ভর না করে যেকোনো সময় ‘মিতা’র মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন। অ্যাকাউন্ট খোলা, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, ঋণ সুবিধা, সঞ্চয়পণ্য, সুদের হার কিংবা ডিজিটাল সেবাসংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্নের উত্তর মিলবে এই ভার্চুয়াল রিলেশনশিপ ম্যানেজারের কাছ থেকে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নতুন মাত্রা
এমটিবির এই উদ্যোগকে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, বাংলাদেশে এআই-চালিত ভার্চুয়াল রিলেশনশিপ ম্যানেজার এই প্রথম কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে চালু হলো।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকের আচরণ, প্রয়োজন ও পছন্দ বিশ্লেষণ করে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা দেওয়া সম্ভব। ‘মিতা’ ধীরে ধীরে গ্রাহকের প্রশ্ন ও ব্যবহার থেকে শিখে আরও দক্ষ হয়ে উঠবে, যা ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সেবার মান আরও বাড়াবে।
গ্রাহকসেবায় সময় ও খরচ সাশ্রয়
ভার্চুয়াল ব্যাংকিং রিলেশনশিপ ম্যানেজার চালুর অন্যতম বড় সুবিধা হলো সময় ও খরচ সাশ্রয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় গ্রাহকদের অনেক সময় ব্যাংকে যেতে হয় বা দীর্ঘক্ষণ কল সেন্টারে অপেক্ষা করতে হয়। ‘মিতা’র মাধ্যমে এসব সাধারণ প্রশ্নের উত্তর মুহূর্তেই পাওয়া যাবে।
এতে একদিকে যেমন গ্রাহকের সময় বাঁচবে, অন্যদিকে ব্যাংকের অপারেশনাল খরচও কমবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের কর্মীরা আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এমটিবির লক্ষ্য ও প্রত্যাশা
এমটিবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাই তাদের ভবিষ্যৎ কৌশলের মূল ভিত্তি। ‘মিতা’ চালুর মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের আরও আধুনিক, নিরাপদ ও স্মার্ট ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা দিতে চায়।
ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুধু গ্রাহকসেবা নয়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং তথ্য বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে ‘মিতা’কে আরও উন্নত করে লেনদেনসংক্রান্ত নির্দিষ্ট সহায়তা, ব্যক্তিগত আর্থিক পরামর্শসহ নানা ফিচার যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট ব্যাংকিং
সরকার ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের পথে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমটিবির এই এআই-ভিত্তিক উদ্যোগ সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা বাড়লে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও প্রযুক্তি-সচেতন গ্রাহকদের কাছে এ ধরনের ডিজিটাল সেবা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা
এআই-ভিত্তিক সেবা চালুর ক্ষেত্রে তথ্য নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। এ বিষয়ে এমটিবি জানিয়েছে, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও লেনদেনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা ও ডেটা প্রটেকশন নীতিমালা অনুসরণ করেই ‘মিতা’ পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া কোনো সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার বা সংরক্ষণ করা হবে না। ফলে গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে এই ভার্চুয়াল রিলেশনশিপ ম্যানেজারের সেবা নিতে পারবেন।
ব্যাংকিং খাতে সম্ভাবনার নতুন দরজা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমটিবির এই উদ্যোগ অন্য ব্যাংকগুলোকেও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এআই, বিগ ডেটা ও অটোমেশনের ব্যবহার আরও বাড়বে, যা সামগ্রিকভাবে গ্রাহকসেবার মান উন্নত করবে।
দেশের প্রথম এআই-চালিত ভার্চুয়াল ব্যাংকিং রিলেশনশিপ ম্যানেজার হিসেবে ‘মিতা’র যাত্রা তাই শুধু এমটিবির জন্য নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাল প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে, আগামী দিনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও স্মার্ট, দ্রুত ও গ্রাহকবান্ধব হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।
#খবরডটকম
0 মন্তব্যসমূহ