রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন: এপস্টেইন কাণ্ডে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে রাজি ক্লিনটন দম্পতি

 


যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত জেফরি এপস্টেইন কাণ্ড নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় মার্কিন কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কংগ্রেস সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। এই সিদ্ধান্তকে এপস্টেইন কাণ্ডের তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কাণ্ড

জেফরি এপস্টেইন ছিলেন একজন ধনকুবের বিনিয়োগকারী, যিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নির্যাতন ও মানব পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যুর পর থেকেই মামলা ঘিরে তৈরি হয় অসংখ্য প্রশ্ন ও সন্দেহ। তদন্তে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও সেলিব্রিটিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য।

এই তালিকায় একাধিকবার উঠে আসে বিল ক্লিনটনের নাম। যদিও ক্লিনটন পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং দাবি করছে—এপস্টেইনের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

কংগ্রেসের তদন্ত ও সাক্ষ্যের প্রস্তাব

মার্কিন কংগ্রেসের একটি বিশেষ কমিটি সম্প্রতি এপস্টেইন কাণ্ডের তদন্ত আরও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটির লক্ষ্য—এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য ব্যর্থতা খতিয়ে দেখা।

এই প্রেক্ষাপটে বিল ও হিলারি ক্লিনটন লিখিতভাবে কংগ্রেসকে জানান, তারা স্বেচ্ছায় সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত। তাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়,

“ক্লিনটন দম্পতি চান, এই কাণ্ড নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও গুজব রয়েছে, তা স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হোক।”

ক্লিনটন দম্পতির অবস্থান

বিল ক্লিনটনের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়,

“সাবেক প্রেসিডেন্ট এপস্টেইনের সঙ্গে সীমিত সামাজিক যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছেন, তবে তিনি কোনো অবৈধ কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং কখনোই এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ বা বিতর্কিত স্থানে যাননি।”

অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে সরাসরি কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখেননি এবং তার স্বামী বা পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে কোনো বেআইনি সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য দিতে রাজি হওয়ার ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ডেমোক্র্যাট শিবিরের অনেক নেতা একে স্বচ্ছতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তদন্তের মুখোমুখি হতে রাজি হওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক।

তবে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য দাবি করছেন, এই সাক্ষ্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে প্রকৃত জবাবদিহির সুযোগ হতে হবে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—এপস্টেইনের রাজনৈতিক যোগাযোগের পূর্ণ চিত্র কি আদৌ সামনে আসবে?

এপস্টেইন নথি ও ‘ফ্লাইট লগ’ বিতর্ক

এপস্টেইন কাণ্ডে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো তথাকথিত ফ্লাইট লগ’—যেখানে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে যাতায়াতকারী যাত্রীদের নাম উল্লেখ আছে বলে দাবি করা হয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দাবি ওঠে, বিল ক্লিনটনের নাম এসব নথিতে রয়েছে।

ক্লিনটন শিবিরের বক্তব্য, ওই সফরগুলো ছিল দাতব্য কার্যক্রমসংক্রান্ত এবং কোনোভাবেই অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্যে এসব সফর ও যোগাযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের প্রতিক্রিয়া

এপস্টেইন কাণ্ডের ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি সংগঠন ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে,

“এই তদন্ত কেবল রাজনৈতিক দায় নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।”

তারা চান, তদন্তের মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কীভাবে বছরের পর বছর দায়মুক্তি পেয়ে এসেছেন, তা স্পষ্ট হোক।

আইনি ও সামাজিক প্রভাব

বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য এপস্টেইন কাণ্ডে নতুন তথ্য উন্মোচন করতে পারে, আবার রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিতর্কও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে এই তদন্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাক্ষ্যগ্রহণের সময় কংগ্রেস চাইলে নতুন নথি তলব করতে পারে এবং প্রয়োজনে অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও ডেকে পাঠাতে পারে।

কংগ্রেস সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাক্ষ্যগ্রহণের সময়সূচি চূড়ান্ত হতে পারে। সাক্ষ্য প্রকাশ্যে হবে নাকি বন্ধ কক্ষে—সে সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। তবে যেভাবেই হোক, এই শুনানি আবারও এপস্টেইন কাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসবে, তা নিশ্চিত।

সব মিলিয়ে, এপস্টেইন কাণ্ডে ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু অতীতের একটি বিতর্কিত অধ্যায় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 #খবরডটকম

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ