
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের আলোচিত ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী পরীমনি কিছুদিন আগে তার জীবনের একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও মানসিকভাবে কঠিন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন – তাঁর মাথার এক অঞ্চলের চুল গুচ্ছাকারে পড়ে গিয়েছিল। এই সমস্যাটি শুধু সামান্য চুল পড়া নয়; এটি ছিল গোছা গোছা করে বড় পরিমাণে চুল পড়ে মাথার নির্দিষ্ট অংশ ফাঁকা হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা।
এই ঘটনাটি মূলত করোনা মহামারির সময়ের — তখন পরীমনি নিজে চিকিৎসা নেওয়ার উপযুক্ত সময় ও সুবিধা পায়নি। পরে চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি ধৈর্য ধরে তার এই চুল পড়ার সমস্যা কাটিয়ে উঠেন, এবং প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছিল পুরোটা ঠিক হয়ে যেতে।
এই ধরনের পরিস্থিতি সমাজে শোনার পর অনেকেই প্রশ্ন করেন: চুল গোছা গোছা করে পড়ে গেলে এর পেছনে কী রোগ-ক্রিয়া থাকতে পারে? সাধারণ চুল পড়া ও এই ‘গুচ্ছাকারে’ চুল পড়া — এর মধ্যে পার্থক্য কী? নিচে এই বিষয়গুলো বিশদে ব্যাখ্যা করা হলো।
১. সাধারণ চুল পড়া বনাম অসাধারণ চুল পড়া
অনেক সময় আমরা শুনি “দিনে কতটি চুল পড়া স্বাভাবিক?” — স্বাভাবিকভাবে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের প্রতিদিন ৫০-১০০ টি চুল পড়া স্বাভাবিক বলে ধরা হয়, এবং নতুন চুলও আসতে থাকে।
কিন্তু মাথার নির্দিষ্ট কোনো অংশ থেকে গুচ্ছাকারে চুল পড়া — অর্থাৎ মাথার এক জায়গা একদম ফাঁকা হয়ে যাওয়ার মতো — সেটি স্বাভাবিক নয়। এটি সাধারণ চুল পড়ার পরিস্থিতির বাইরে একটি রোগ-সম্পর্কিত অবস্থার ইঙ্গিত।
এমন ধরনের চুল পড়ার সমস্যার পেছনে মূলত দুটো বড় কারণ থাকতে পারে:
২. অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা (Alopecia Areata)
এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজের চুলের ফলিকল বা হেয়ার ফলিকলকে আক্রমণ করে বসে। ফলে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মাথার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে হঠাৎ করে চুল পড়ে যায়, এমনকি পুরো অংশ টাকও হতে পারে।
অ্যালোপেসিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য:
এই অবস্থায় চিকিৎসা করালে অনেক সময় চুল আবার ফিরে আসে; কিন্তু রোগের প্রকৃতি ও দেহের প্রতিক্রিয়ার ওপর কিছুটা নির্ভর করে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
৩. ছত্রাক সংক্রমণ (Fungal Infection / Tinea Capitis)
অপর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো মাথার ছত্রাক সংক্রমণ, যা স্ক্যাল্পে ঘনভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের সংক্রমণে মাথার একটি অংশ থেকে চুল বেরিয়ে যায়, কিন্তু ছত্রাক সংক্রমণে:
সাধারণত সেই অংশে পরিপূর্ণ টাক দেখা যায় না; কিছু চুল অব্যাহত থাকে।আক্রান্ত এলাকাটি চুলকায়।
ছত্রাকটি অন্যান্য ব্যক্তির মাঝেও ছড়িয়ে যেতে পারে যদি সংক্রমণ থেকে সরে হাইজিন নীতি অনুসরণ না করা হয়।
অতএব, যেহেতু দুইটি লক্ষণ — টাক হয়ে যাওয়া ও চুলকানি — অন্যভাবে প্রকাশ পায়, সেক্ষেত্রে ডাক্তার সঠিক পরীক্ষা করে রোগের ধরন নির্ণয় করেন।
৪. কেন এমন ঘটনা ঘটে? – সম্ভাব্য কারণ ও চিকিৎসা
স্ট্রেস ও ইমিউন রিপন্ড
মানসিক ও শারীরিক চাপের সময় শরীরের হরমোন ও ইমিউন ব্যবস্থা বদলে যায়। অধিক স্ট্রেস, দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা বা পুষ্টির ঘাটতি ইমিউনকে ভুলভাবে চুলের ফলিকল আক্রমণ করতে বাধ্য করতে পারে, ফলে অ্যালোপেসিয়া হতে পারে।
পুষ্টি ও হরমোন
চুল পড়া সাধারণত পুষ্টি ঘাটতি (যেমন আয়রন, ভিটামিন বি, বায়োটিন) বা হরমোন্যাল ইমব্যালান্সেও হতে পারে। যদিও এই ধরনের চুল পড়া সাধারণত গোছা গোছা করে নির্দিষ্ট অংশ কেটে দেয় না।
ব্যক্তিগত বিবরণ অনুযায়ী ঘটনা
পরীমনি জানিয়েছেন, করোনা সময়ে তার জীবনের বিভিন্ন চাপ ও পরিস্থিতির কারণে প্রথমে তিনি চিকিৎসা নিলেন না। তাই চুল পড়া অধিকতর প্রকাশ পেয়েছিল। দেড় বছর চিকিৎসা নিয়ে ধৈর্য ধরে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়েছেন।
চিকিৎসা ও প্রতিকার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ মতামত
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ধরনের ‘গুচ্ছাকারে’ চুল পড়া দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডার্মাটোলজিস্ট (ত্বক বিশেষজ্ঞ)-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ:
সঠিক কারণ জানার পর উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা যায়।ভুল চিকিৎসা বা শুধু ঘরোয়া টোটকা-তে ভরসা করলে অবস্থার চরম অবনতি ঘটতে পারে।
যদিও কিছু ঘরোয়া সংক্রান্ত টোটকা যেমন পেঁয়াজের রস, আমলকী, মেথি ইত্যাদি চুলের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে, এগুলো শুধুমাত্র অতিরিক্ত সাধারণ চুল পড়া নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করে; রোগ-বিশেষের চিকিৎসার বিকল্প নয়।
পরীমনির অভিজ্ঞতা ও রোগের ব্যাখ্যা
পরীমনির মাথা থেকে গোছা গোছা চুল পড়ার অভিজ্ঞতা হলো অতি দায়িত্বশীল স্বাস্থ্য বিষয়ক সংবাদ, যেখানে একটি ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত সমস্যার কথা সমাজের সামনে খুলেছেন। এটি প্রমাণ করে যে:
চোখে সাধারণ চুল পড়া ও গুরুতর ধরনের ‘গুচ্ছাকারে’ চুল পড়া — উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে।এতে সাধারণ জীবনযাত্রা-সম্পর্কিত স্ট্রেস, পুষ্টি ঘাটতি বা চিকিৎসা অভাবের মতো বিষয়গুলো একসাথে জড়িত থাকতে পারে।
সঠিক চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়া হলে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
পরীমনি নিজেও দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়েছেন এবং আবার নিজের স্বাভাবিক জীবন ও কর্মে ফিরে এসেছেন — যা চিকিৎসা বিজ্ঞান ও রোগ-সহ্য করার ক্ষেত্রে এক ইতিবাচক উদাহরণ।
আপনি চাইলে আমি এই অ্যালোপেসিয়া বা অন্যান্য চুল পড়া সম্পর্কিত রোগ-ভিত্তিক বিস্তৃত চিকিৎসা ব্যাখ্যা, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শ, কিংবা চুল পড়া প্রতিরোধ ও সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা নিয়েও আলাদা করে একটি গভীর বিশ্লেষণও তৈরি করে দিতে পারি। জানালে আমি সেই ভিত্তিতেই লেখাটি সাজিয়ে দেব।
#খবরডটকম #khabardotkom
0 মন্তব্যসমূহ