
নতুনভাবে নির্বাচিত সরকারের সামনে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে—এমন মন্তব্য করেছেন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে আগামী দিনে নীতিনির্ধারকদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে না।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি একাধিক ঝুঁকির মুখে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। অর্থনীতির গতিপথ হবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে সঠিক নীতি ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।”
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চাপ
বিশ্ব অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে পারেনি। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং প্রধান অর্থনীতিগুলোর সুদের হার নীতি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ের ওপর চাপ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়
দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে মূল্যস্ফীতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি। তবে এটি কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজার তদারকি বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়াতে পারলে এবং পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটালে বাজারে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার সংকট
গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় ডলার সংকট তৈরি হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা জানান, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রয়োজন। তিনি বলেন, “রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রবাসী আয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।”
এছাড়া বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দেন।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন অর্থ উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। কর্মসংস্থান না বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।” বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাকে তিনি অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
শিল্প খাতের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ এবং সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রাজস্ব আদায় ও বাজেট ব্যবস্থাপনা
রাজস্ব আদায় বাড়ানো ছাড়া সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম টেকসই করা কঠিন—এ কথা স্বীকার করেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, কর নেট সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনে সংস্কার এবং কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
তার মতে, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক খাত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।
কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন
অর্থ উপদেষ্টা মনে করেন, স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে আনা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা পরিচালনার সহজীকরণ জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। খেলাপি ঋণ কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি।”
সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অর্থ উপদেষ্টা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সঠিক নীতি ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। তিনি বলেন, দেশের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনশক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি।
তার ভাষায়, “চ্যালেঞ্জ বড় হলেও সম্ভাবনাও কম নয়। নির্বাচিত সরকার যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে, তাহলে অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল ও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হবে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী দিনগুলোতে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন দক্ষতাই নির্ধারণ করবে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ। নতুন সরকারের জন্য এই সময়টি হবে পরীক্ষা ও সুযোগ—দুটোই একসঙ্গে।
#অর্থবাণিজ্য #খবরডটকম
0 মন্তব্যসমূহ