এপস্টেইন কাণ্ড: প্রকাশিত নথিতে আলোচনায় বিশ্ব প্রভাবশালীরা

 


জেফ্রি এপস্টেইন—এই নামটি গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা, প্রভাব ও নৈতিকতার প্রশ্নে গভীর আলোড়ন তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের অর্থনীতিবিদ থেকে দণ্ডিত যৌন অপরাধী হিসেবে পরিচিত এপস্টেইনের সঙ্গে বিভিন্ন সময় রাজনীতি, ব্যবসা, রাজপরিবার ও বিনোদন জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগের কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন আদালতের নথি, সাক্ষ্য ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নথিতে কারও নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অনেক ক্ষেত্রেই নাম এসেছে সাক্ষ্য, যোগাযোগ, সামাজিক পরিচিতি বা তদন্তের প্রেক্ষিতে।

এই প্রতিবেদনে এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিতে আলোচিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রেক্ষাপট, অভিযোগের ধরন (যদি থাকে), এবং সংশ্লিষ্টদের অবস্থান সংক্ষেপে ও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা হলো।

নথি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

এপস্টেইন মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে জমা পড়া নথিতে সাক্ষ্য, ই-মেইল, ফ্লাইট লগ, যোগাযোগের তালিকা ও জবানবন্দির উল্লেখ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আদালতের আদেশে কিছু নথি জনসমক্ষে আসে, ফলে বহু পরিচিত নাম নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। এই নথিগুলো তথ্যসূত্র—রায় নয়; তাই সাংবাদিকতা নীতিমালা অনুযায়ী সতর্ক ব্যাখ্যা জরুরি।

ব্রিটিশ রাজপরিবার: প্রিন্স অ্যান্ড্রু

এপস্টেইনের সঙ্গে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর পরিচয়ের বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচিত। এক নারী এপস্টেইনের সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের মাধ্যমে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেও প্রিন্স অ্যান্ড্রু তা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি হয় আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে, যা কোনো অপরাধ স্বীকারের সমতুল নয়। তবুও বিষয়টি রাজপরিবারের ভাবমূর্তিতে বড় প্রভাব ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি

এপস্টেইনের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মার্কিন রাজনৈতিক মহলের পরিচিতির কথা নথিতে এসেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন–এর নাম ফ্লাইট লগে উল্লেখিত থাকলেও ক্লিনটন শিবির থেকে বলা হয়েছে, তিনি কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না এবং এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাননি। একইভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে সামাজিক পরিচিতির কথা স্বীকার করলেও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি পরে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

বিল গেটস

মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের এপস্টেইনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের কথা গণমাধ্যমে উঠে আসে। গেটস পরে প্রকাশ্যে বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ছিল বড় ভুল, এবং তিনি কোনো অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন না। নথিতে নাম আসা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি।

লেস ওয়েক্সনার

ফ্যাশন রিটেইল গ্রুপ এল ব্র্যান্ডসের প্রতিষ্ঠাতা ওয়েক্সনার এপস্টেইনের আর্থিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে আস্থা ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন এবং নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। নথিতে তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপরাধ প্রমাণের কোনো রায় নেই।

শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্খ্ বিজ্ঞানী ও অধ্যাপকরা

এপস্টেইন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রকল্পে অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। হার্ভার্ড ও এমআইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অধ্যাপকের নাম নথিতে এসেছে—যা পরে প্রতিষ্ঠানগুলো নৈতিক পর্যালোচনা ও নীতিমালা সংশোধনে বাধ্য হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ ছিল অর্থনৈতিক বা নৈতিক বিচ্যুতি নিয়ে, ফৌজদারি অপরাধ নয়।

হলিউড ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

অভিনেতা, প্রযোজক ও মিডিয়া জগতের কিছু নাম সামাজিক যোগাযোগ বা অনুষ্ঠানে উপস্থিতির সূত্রে নথিতে এসেছে। এদের অনেকেই স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে তারা জানতেন না এবং কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। এখানে সামাজিক উপস্থিতি বনাম অপরাধে জড়িত থাকা—এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করা জরুরি

গিসলেন ম্যাক্সওয়েল: সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু

এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের ভূমিকা নথিতে কেন্দ্রীয়। তিনি মানব পাচার ও কিশোরী পাচারে সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁর জবানবন্দি ও নথিতেই বহু প্রভাবশালী নাম উঠে আসে। তবে আইনগতভাবে ম্যাক্সওয়েলের বক্তব্য নিজেই প্রমাণ নয়—এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।

কেন “নাম আসা” মানেই অপরাধ নয়

আইন বিশেষজ্ঞরা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন—

  • নথিতে নাম থাকা ≠ অপরাধ প্রমাণ
  • সাক্ষ্য ও অভিযোগ ≠ রায়
  • সামাজিক বা পেশাগত যোগাযোগ ≠ অপরাধে জড়িত থাকা

এই কারণেই দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমগুলো ভাষা নির্বাচনে সতর্ক থাকে এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তুলে ধরে।

এপস্টেইন কেলেঙ্কারি বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, এলিট নেটওয়ার্কের অস্বচ্ছতা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার জটিলতা সামনে এনেছে। এর ফল হিসেবে—

  • দাতব্য অনুদান গ্রহণে কঠোর নীতিমালা
  • বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
  • ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় আইনি সংস্কার

এসব উদ্যোগ জোরদার হয়েছে।

এপস্টেইন নথিতে প্রভাবশালী বহু ব্যক্তির নাম এসেছে—কিন্তু আইনগত সত্য নির্ধারণ হয় আদালতে, জনমতের চাপে নয়। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কাজ হলো তথ্য, প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্টদের অবস্থান একসঙ্গে তুলে ধরা। এপস্টেইন কেলেঙ্কারি আমাদের শেখায়—ক্ষমতা যত বড়ই হোক, জবাবদিহি অপরিহার্য; আর ন্যায়বিচারের পথে সতর্কতা ও প্রমাণই শেষ কথা।


#খবরডটকম

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ