
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে একটি আলোচনা বেশ জোরালো হয়েছে—আজকের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন–জি (১৯৯৭–২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারীরা), বয়সের তুলনায় আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে। এই আলোচনার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং গবেষকদের বিশ্লেষণ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও সামাজিক বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণও যুক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, জীবনযাপন, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাস ও ডিজিটাল নির্ভরতার কারণে জেন–জিদের শারীরিক ও মানসিক বয়স দৃশ্যমানভাবে বেশি মনে হতে পারে।
গবেষণায় কী বলা হচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত সাম্প্রতিক কয়েকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেন–জিদের মধ্যে ত্বকের আগাম বার্ধক্য, চোখের নিচে কালি, চুলের অকাল পাকা হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির লক্ষণ তুলনামূলকভাবে বেশি। গবেষকেরা বলছেন, এটি কোনো একটি কারণের ফল নয়; বরং একাধিক সামাজিক ও জৈবিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “জৈবিক বয়স” এবং “দৃশ্যমান বয়স” সব সময় সমান হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই একজন মানুষের বয়স কম হলেও তার ত্বক, ভঙ্গি বা স্বাস্থ্যগত লক্ষণ তাকে বেশি বয়সী দেখাতে পারে। জেন–জিদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধানটাই এখন বেশি চোখে পড়ছে।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগের ভূমিকা
গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো মানসিক চাপ। জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করার চাপ—সব মিলিয়ে জেন–জি প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগের মধ্যে বেড়ে উঠছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ায়, যা ত্বকের কোলাজেন নষ্ট করে এবং আগাম বার্ধক্যের লক্ষণ তৈরি করে। ঘুমের অভাব ও মানসিক ক্লান্তি মুখের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, ফলে বয়সের তুলনায় বয়স্ক দেখানোর প্রবণতা বাড়ে।
ডিজিটাল জীবনধারা ও স্ক্রিন টাইম
জেন–জি হচ্ছে প্রথম প্রজন্ম, যারা ছোটবেলা থেকেই স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম চোখের চারপাশে চাপ সৃষ্টি করে, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল করে এবং মুখের পেশিতে স্থায়ী ক্লান্তির ছাপ ফেলে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে শরীরের ভঙ্গি বা পোস্টারও পরিবর্তিত হয়। কাঁধ ঝুঁকে থাকা, ঘাড় নিচু করে রাখা—এসব কারণে শরীরী ভাষা অনেক সময় বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক মনে হয়।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের প্রভাব
পুষ্টিবিদদের মতে, জেন–জিদের খাদ্যাভ্যাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও ক্যাফেইন গ্রহণ আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় বেশি। এসব খাবারে থাকা উচ্চমাত্রার সোডিয়াম ও সংরক্ষণকারী উপাদান ত্বকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নিয়মিত ব্যায়ামের অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক জেন–জি তরুণ দীর্ঘ সময় বসে কাজ করে বা অনলাইনে সময় কাটায়, ফলে শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব রক্তসঞ্চালন কমিয়ে দেয়, যা ত্বকের উজ্জ্বলতা কমিয়ে আগাম বার্ধক্যের লক্ষণ তৈরি করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সৌন্দর্য ধারণা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিল্টার, এডিট করা ছবি ও নিখুঁত সৌন্দর্যের প্রচারও জেন–জিদের আত্মদৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কেউ নিজের বাস্তব চেহারার সঙ্গে ফিল্টার করা চেহারার তুলনা করে, তখন মানসিক চাপ বাড়ে। এই চাপ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা শারীরিকভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
এ ছাড়া সৌন্দর্যপণ্য ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। অল্প বয়সেই অ্যান্টি-এজিং প্রোডাক্ট বা শক্তিশালী স্কিন কেয়ার উপাদান ব্যবহারের ফলে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা উল্টো বয়সের ছাপ বাড়িয়ে দেয় বলে গবেষকেরা সতর্ক করছেন।
তবে কি জেন–জি সত্যিই দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে?
গবেষকেরা বলছেন, “বয়স্ক দেখানো” আর “বুড়িয়ে যাওয়া” এক নয়। জেন–জিদের গড় আয়ু বা শারীরিক সক্ষমতা আগের প্রজন্মের তুলনায় কম—এমন প্রমাণ এখনো নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা স্বাস্থ্যসচেতন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলে এবং সাহায্য নিতে আগ্রহী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতাকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। সঠিক জীবনযাপন, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিলে এই প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সমাধানের পথে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
চিকিৎসক ও গবেষকেরা জেন–জিদের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে—নিয়মিত ঘুম, স্ক্রিন টাইম সীমিত করা, শারীরিক ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং মানসিক চাপ কমানোর কৌশল শেখা।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে বাস্তব জীবনের স্বাস্থ্য ও সুখকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বয়সের ছাপ কেবল বাহ্যিক বিষয় নয়; মানসিক সুস্থতা ও আত্মতৃপ্তিই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে তরুণ রাখে।
বয়সের তুলনায় জেন–জিদের বয়স্ক দেখানোর বিষয়টি নিছক একটি সামাজিক ট্রেন্ড নয়; এর পেছনে রয়েছে আধুনিক জীবনের জটিল বাস্তবতা। গবেষকেরা বলছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে—যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য, জীবনযাপন ও প্রযুক্তির ভারসাম্য রক্ষা করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে জেন–জি প্রজন্ম কেবল বয়সের ছাপ কমাতেই নয়, বরং একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতেও সক্ষম হবে।
0 মন্তব্যসমূহ