
বোমাবর্ষণে বিপর্যস্ত মিয়ানমার, বিশ্ব সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মিয়ানমারে চলমান সংঘাত নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ তুলেছেন দেশটির এক প্রভাবশালী সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা। তার দাবি, সামরিক জান্তার অব্যাহত বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংস হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সীমিত বিবৃতির মধ্যেই আটকে রয়েছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার কার্যত গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ও গণতন্ত্রপন্থী বাহিনী একত্র হয়ে জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংঘাতের তীব্রতা আরও বেড়েছে, বিশেষ করে বিমান হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ গভীর হয়েছে।
সশস্ত্র প্রতিরোধ জোটের এক নেতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, “আমাদের জনগণ প্রতিদিন বোমা হামলার মুখে পড়ছে। গ্রাম ধ্বংস হচ্ছে, স্কুল ও হাসপাতাল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব যেন নীরব দর্শক হয়ে আছে।” তার মতে, মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক চাপ—দুই ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে চিকিৎসা সেবা, খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে, ফলে আঞ্চলিক মানবিক সংকটের ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার সংকটে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘে ঐকমত্যের অভাব, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভিন্ন অবস্থান এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নিরাপত্তা ঝুঁকি—সব মিলিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ কঠিন হয়ে উঠেছে। তবুও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এদিকে সামরিক জান্তা দাবি করে আসছে যে তারা “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান” পরিচালনা করছে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য। তবে স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাস্তবে সংঘাতের মূল ভার বহন করছে সাধারণ মানুষই। বিশেষ করে দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে তথ্যপ্রবাহ সীমিত হওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র অনেক সময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিফলিত হয় না।
মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, চলমান সহিংসতা অব্যাহত থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং শিশুদের শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে হাজারো শিশু বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং অনেক এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে একটি “হারানো প্রজন্ম” তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও মানবিক সহায়তা—এই তিনটি পথ নিয়েই আলোচনা চলছে। তবে সশস্ত্র প্রতিরোধ নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, “শুধু বিবৃতি দিয়ে জীবন রক্ষা করা যায় না; বাস্তব পদক্ষেপ দরকার।” তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নজরদারি জোরদারের দাবি তোলেন।
পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্যযুদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম সীমিত হওয়ায় সংঘাতের বাস্তব চিত্র অনেক সময় বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছায় না। ফলে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে কূটনৈতিক মহলের কিছু সূত্র বলছে, নেপথ্যে সংলাপের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আঞ্চলিক জোট ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সহিংসতা কমাতে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছে। যদিও এসব প্রচেষ্টার দৃশ্যমান ফল এখনো স্পষ্ট নয়, তবুও সংলাপের পথ খোলা রাখা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং জীবিকা সংকট তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। সশস্ত্র প্রতিরোধ নেতার আক্ষেপ তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—বরং একটি মানবিক সংকটের প্রতিফলন, যা দ্রুত আন্তর্জাতিক মনোযোগ দাবি করছে।
বিশ্ব সম্প্রদায় কতটা কার্যকরভাবে সাড়া দেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সহিংসতা অব্যাহত থাকলে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে। তাই বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংলাপ, বেসামরিক সুরক্ষা এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই পদক্ষেপগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
#বিশ্ব #খবরডটকম #khabardtkom
0 মন্তব্যসমূহ