
সিরিজ যতই মনোমুগ্ধকর প্রেমকাহিনি ও গসিপে ভরপুর হোক না কেন, তার একাধিক দিক—বিশেষ করে পোশাক—কে নিয়েই ফ্যাশন ও ইতিহাস পছন্দ করার মানুষের মধ্যে বড় বিতর্ক গড়ে উঠেছে। এই লিখায় আমি বিশ্লেষণ করবো: সিরিজে দেখা পোশাকগুলো ইতিহাসের সঙ্গে কতটা মিল রেখে তৈরি, আর আসলে Regency যুগের (c. 1795–1837) ফ্যাশন কেমন ছিল।
জনপ্রিয় রিজেন্সি যুগের রোমান্স সিরিজ ‘ব্রিজেটন’ নতুন সিজন নিয়ে নেটফ্লিক্সে ফিরে এসেছে। ২৯ জানুয়ারি থেকে এই সিজনের প্রথম অংশ দেখানো শুরু হয়েছে, এবং এর দ্বিতীয় অংশ ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে দেখা যাবে। নির্মাতাদের বিশ্বাস, এই শো আবারও রোমান্টিক সিরিজের শীর্ষে পৌঁছাবে। সিরিজটির পোশাক এবং সাজসজ্জা গল্পের মতোই আলোচনায় থাকে।
যাঁরা এই সিরিজ সম্পর্কে জানেন না, তাঁদের জন্য বলছি, ‘ব্রিজেটন’ একটি রোমান্টিক এবং বিকল্প ইতিহাসের টেলিভিশন সিরিজ, যা ব্রিটিশ রিজেন্সি যুগের (প্রায় ১৮১১-১৮২০) সমাজকে তুলে ধরে। গল্পের শুরু ১৮১৩ সালে। আঠারো শতকের প্রারম্ভিক ফ্যাশন কিভাবে নাটকীয়ভাবে ‘ব্রিজেটন’ প্রদর্শন করেছে, তা নিয়ে ফ্যাশন জগতে অনেক প্রশ্ন উঠেছে।
অনেকে জানতে চান, এসব পোশাক কি সত্যিই রিজেন্সি যুগে পরা হতো? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ। ‘ব্রিজেটন’-এর নির্মাতারা কখনো ইতিহাসকে যথাযথভাবে উপস্থাপনের দাবি করেননি। এটি এই সিরিজের মূল লক্ষ্যও নয়। গল্পটি একটি কাল্পনিক ব্রিটেনে বিন্যস্ত, যেখানে আধুনিক সঙ্গীত বাজে এবং চরিত্ররা আজকের ভাষায় কথা বলে।
তবুও, অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৭৯৫ থেকে ১৮৩৭ সালের রিজেন্সি যুগকে ‘ব্রিজেটন’ যে রকম রঙিন, প্রাণবন্ত এবং কিছুটা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেছে, তাতে সেই সময়ের আনন্দ, সাহস এবং সমাজে পরিবর্তনের আবহ কিছুটা জীবন্ত হয়ে ওঠে। অনেক গম্ভীর এবং বাস্তবমুখী রূপান্তরের চেয়ে এই কল্পনাটি হয়তো ইতিহাসের মেজাজকে ভালোভাবে ধরতে পেরেছে।
রিজেন্সি যুগ শুধুমাত্র রাজনীতি বা ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি পোশাকের জগতে একটি বড় পরিবর্তনের সময়ও ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে ফ্যাশন প্রায় অপরিবর্তিত ছিল, সেখান থেকে ভাঙন দেখা যায়। পোশাকের কাট, কাপড়ের ব্যাবহার, সাজ-সজ্জার ধরন—সবকিছুর মধ্যেই নতুন চিন্তা এবং সাহসী পরিবর্তন এসেছে।
একই সঙ্গে বদলে যেতে থাকে ব্রিটিশ ফ্যাশন শিল্পের পুরো কাঠামো। অদ্ভুত হলো, ওই সময়ের ফ্যাশনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কোনো রানি বা রাজকুমারী নয়; বরং রিজেন্সি যুগের ফ্যাশন গড়ে উঠেছিল প্রিন্স রিজেন্টের বিতর্কিত এবং বিলাসবহুল প্রেমিকাদের হাত ধরে। তাঁদের বিলাসী জীবনযাপন, সাহসী পোশাক এবং সামাজিক আলোচনা ঠিক করে দিচ্ছিল কী পোশাক পরতে হবে এবং কীভাবে পরতে হবে।
‘প্রিন্স রিজেন্ট’ বলতে সাধারণত যুক্তরাজ্যের রাজা চতুর্থ জর্জকে উল্লেখ করা হয়। ১৮১১ থেকে ১৮২০ পর্যন্ত তিনি তাঁর অসুস্থ বাবা, রাজা তৃতীয় জর্জের হয়ে শাসন করেছেন। এই সময়কালে তিনি ‘রিজেন্সি পিরিয়ড’ হিসেবে পরিচিত। প্রিন্স রিজেন্ট বিলাসবহুল জীবনযাপনে আগ্রহী ছিলেন এবং শিল্প, সাহিত্য এবং ফ্যাশনে তিনি বড় মাপের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তবে এই বিলাসিতা এবং শোভা সবসময় সমালোচনার নজরে থাকত।
ফরাসি ভাষায় ‘আম্পিয়ার ওয়েস্ট’ বলে পরিচিত এবং ইংরেজিতে ‘এম্পায়ার-ওয়েস্ট’ নামে পরিচিত। এটি ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তী বছরগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সময়ের উচ্চ সমাজের জটিল এবং অতিরিক্ত সাজ অনেকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে শুরু করে। ফলে মানুষ সহজ এবং সাধারণ পোশাকের দিকে আকৃষ্ট হতে শুরু করে, যেমন রোমান এবং গ্রিক শিল্পে দেখা যায়। আঠারো শতকের শেষভাগে এই স্টাইল প্রচলিত হয়ে ওঠে। সাধারণত এগুলোর সঙ্গে তুলার সেমিজ এবং ‘ফিশু’ নামক ছোট শাল পরা হতো। ফিশু ঘাড়ের চারপাশ ঢেকে পোশাকের উপরের অংশে ঢোকানো হতো, ফলে এম্পায়ার স্টাইলের নিচু নেকলাইন আবৃত হয়ে যেত। বুকের অনাবৃত অংশ দৃশ্যমান হত না।
‘ব্রিজেটন’–এর সিজন ফোরে বাড়ির সহযোগীদের পোশাকে এগুলোর ব্যবহার দেখা যায়, যদিও খুব অল্প। এখানে দর্শকদের চোখ ধাঁধানোর জন্য উজ্জ্বল, নাটকীয় পোশাক এবং গল্পের রোমান্সকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এম্পায়ার-লাইন ড্রেস: সাধারণ, কিন্তু বলার মতো অনেক কিছু
পিরিয়ড ড্রামায় এম্পায়ার-লাইনের পোশাক পরা মানে এক বিশেষ ধরনের ভিজ্যুয়াল সংকেত প্রদান করা। সাধারণ সোজা কাটের গাউন, যা বুকের নিচ থেকে কোমর পর্যন্ত আঁটসাঁট করা হয়। এই ধরনের পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, যেন আমরা ইংরেজ ঔপন্যাসিক জেন অস্টেনের সময়ে প্রবেশ করছি। এই পোশাকের ডিজাইন এমন যে, এখানে নাচের আসর উপস্থিত থাকবে, সেনা কর্তাদেরও দেখা যাবে—কেউ প্রসিদ্ধ, কেউ আবার আলোচনা সাপেক্ষ। দৃশ্যের শেষ হবে এক-দুটি বিয়ের উপস্থাপনায়। এই ছোট্ট পোশাকের নকশাই পাঠক বা দর্শকের কাছে সেই যুগের আবহ, সামাজিক আচরণ এবং রোমান্সের ধারণা নিয়ে আসতে পারে।
সাধারণ কিন্তু রুচিসম্পন্ন টেইলকোট
রিজেন্সি যুগে পুরুষদের পোশাক ছিল সাধারণত নীরস, নিস্তেজ; অর্থাৎ খুব বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করত না। তখন লন্ডনে সবচেয়ে ভালো পোশাকের অধিকারী ছিলেন জর্জ ‘বিউ’ ব্রামেল। তিনি ছিলেন এক দোকানদারের সন্তান। তবে প্রিন্স রিজেন্টের বন্ধু হওয়ার কারণে তিনি সহজেই উচ্চ সমাজে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
ব্রামেলের স্টাইলের কেন্দ্রে ছিল সরলতা, মার্জিততা এবং সহজলভ্যতা। একবার তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘যদি কেউ রাস্তার মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে, তবে আপনি ঠিকমত সাজেননি। আপনি হয় খুব বেশি যত্নবান অথবা খুব সংকীর্ণ বা আধুনিক পোশাকে রয়েছেন।’
প্রকৃতপক্ষে, ব্রামেল তার পোশাকের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। কথিত আছে, তিনি প্রতিদিন সাজের জন্য পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় ব্যয় করতেন। তাঁর স্টাইল যতই সাধাসিধে হোক না কেন, পোশাকের প্রতিটি উপাদান ছিল নিখুঁত। এমনকি তার ক্রেভাট বাঁধতে এবং সেটাই ঠিক করতে এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় কাটাতেন। তিনি সাধ simplicity পছন্দ করলেও তাঁর পোশাকে রঙিন এবং উচ্চমানের কাপড়ের ছাপ স্পষ্ট ছিল। যেমনটি দেখা যায় ‘ব্রিজেটন’-এ।
0 মন্তব্যসমূহ