
২০১৮ সালের অক্টোবরে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ মোড় এনে দেয়। ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তোলে এবং সৌদি আরবের শীর্ষ নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিক চাপে ফেলে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) দিকে ইঙ্গিত করেছে, সৌদি সরকার বরাবরই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উঠে আসা কিছু বিশ্লেষণ ও কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে—এই হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং এমবিএসকে কোণঠাসা করার পেছনে কি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদের (এমবিজেড) কোনো ভূমিকা ছিল?
খাসোগি হত্যাকাণ্ড: ঘটনার সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট
জামাল খাসোগি ছিলেন সৌদি রাজপরিবারের সাবেক ঘনিষ্ঠ, পরে সমালোচক সাংবাদিক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট-এ সৌদি শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে নিয়মিত কলাম লিখতেন। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর তুরস্কে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর তিনি আর বের হননি। পরে তুর্কি কর্তৃপক্ষ জানায়, কনস্যুলেটের ভেতরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি আরবের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো সৌদি নেতৃত্বের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও চাপ আরোপ করে। যদিও সৌদি আদালত কয়েকজন কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, তবে যুবরাজ এমবিএস সরাসরি দায় অস্বীকার করেন।
এমবিএস ও এমবিজেড: মিত্র না প্রতিদ্বন্দ্বী?
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদকে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হতো। ইয়েমেন যুদ্ধ, মুসলিম ব্রাদারহুড বিরোধিতা এবং ইরান প্রশ্নে দুজনের অবস্থান ছিল প্রায় একই।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের পর থেকে তাদের সম্পর্কে সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার ছাপ স্পষ্ট হতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্বের প্রশ্নে সৌদি আরব ও আমিরাত উভয়ই নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। বিশেষ করে অর্থনীতি, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে দুই দেশের মধ্যে নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়।
এমবিজেডের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে কেন সন্দেহ?
কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকের মতে, খাসোগি হত্যার পর যেভাবে আন্তর্জাতিক মহলে এমবিএসকে লক্ষ্য করে তথ্য ছড়িয়েছে, তার কিছু অংশ এসেছে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেই। অভিযোগ উঠেছে, আমিরাতের কিছু নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সূত্র পশ্চিমা মিডিয়া ও গোয়েন্দা মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রেখে সৌদি যুবরাজের বিরুদ্ধে তথ্য প্রবাহে সহায়তা করেছে।
এই ধারণার পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়:
-
ক্ষমতার ভারসাম্য: এমবিএস দ্রুত সৌদি আরবকে সংস্কারের পথে নিয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে শুরু করেন, যা আমিরাতের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে।
-
ওয়াশিংটনের প্রভাব: এমবিজেড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মহলে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সৌদি যুবরাজকে চাপে রাখার কৌশল নেওয়া হতে পারে—এমন ধারণা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
-
আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা: লিবিয়া, সুদান এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে সৌদি-আমিরাত নীতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনকে সামনে আনে।
প্রমাণ নাকি রাজনৈতিক অনুমান?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই অভিযোগের পেছনে কি কঠিন প্রমাণ আছে? বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সরাসরি এমবিজেডের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। অধিকাংশ দাবি নির্ভর করছে বিশ্লেষণ, কূটনৈতিক সূত্র এবং আঞ্চলিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে “তথ্য ফাঁস” ও “কৌশলগত নীরবতা” একটি পরিচিত অস্ত্র। সরাসরি অপরাধে জড়িত না হয়েও কোনো রাষ্ট্র বা নেতা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে তথ্যপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারেন।
সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের বর্তমান চিত্র
খাসোগি হত্যার কয়েক বছর পর সৌদি আরব ও আমিরাত প্রকাশ্যে আবারও ঘনিষ্ঠতার বার্তা দিচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ওপেক-প্লাস নীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।
তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক এখন আর নিঃশর্ত নয়। পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা থাকলেও নেতৃত্বের প্রশ্নে নীরব প্রতিযোগিতা রয়ে গেছে।
উপসংহার: সন্দেহ, রাজনীতি ও বাস্তবতা
জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা। সৌদি যুবরাজ এমবিএসকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা থাকতে পারে—এমন সন্দেহ রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ হলেও এখন পর্যন্ত এটি প্রমাণিত সত্য নয়।
মোহাম্মদ বিন জায়েদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মূলত আঞ্চলিক রাজনীতির জটিলতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করে। বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মিত্রতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই একসঙ্গে চলে, আর খাসোগি হত্যাকাণ্ড সেই জটিল সমীকরণকে আরও উন্মোচিত করেছে।
এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর হয়তো কখনোই পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসবে না, তবে ঘটনাটি সৌদি-আমিরাত সম্পর্ক এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলবে—এতে সন্দেহ নেই।
#খবর ডটকম
0 মন্তব্যসমূহ