
বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক বড় ধরনের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট কর্মীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই ছাঁটাইয়ের ফলে চাকরি হারিয়েছেন বহু অভিজ্ঞ সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক বিভাগের কর্মীরা। আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভারতের কংগ্রেস নেতা ও সাংসদ শশী থারুরের ছেলে ঈশান থারুরের চাকরি হারানোর খবরও।
কেন এই ছাঁটাই
ওয়াশিংটন পোস্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিজিটাল মিডিয়ায় পরিবর্তনশীল পাঠক আচরণ, বিজ্ঞাপন আয়ের ধারাবাহিক পতন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একসময় প্রিন্ট ও ডিজিটাল উভয় মাধ্যমেই শক্ত অবস্থান ধরে রাখা সংবাদপত্রটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবস্ক্রিপশন বৃদ্ধিতে ধীরগতি এবং বিজ্ঞাপন বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।
মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ওয়াশিংটন পোস্ট নয়—নিউইয়র্ক টাইমস, বাজফিড, ভাইস, সিএনএনসহ বিশ্বের বহু বড় সংবাদমাধ্যমই একই ধরনের চাপে রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাঠক ধরে রাখতে ব্যয় বাড়লেও প্রত্যাশিত আয়ের প্রবাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
কতজন কর্মী প্রভাবিত
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, এই ছাঁটাইয়ের ফলে বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মী সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন। সংবাদ কক্ষের পাশাপাশি প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ভিডিও প্রোডাকশন এবং মার্কেটিং বিভাগেও কাটছাঁট করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার কৌশলের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে কর্মীদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, হঠাৎ করে চাকরি হারানো শুধু আর্থিক নয়, মানসিক দিক থেকেও বড় ধাক্কা।
ঈশান থারুরের চাকরি হারানো
এই ছাঁটাইয়ের খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তি আলোচনার জন্ম দেয় ঈশান থারুরের চাকরি হারানোর বিষয়টি। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টের আন্তর্জাতিক বিভাগে কাজ করতেন এবং বৈশ্বিক রাজনীতি ও কূটনীতি বিষয়ে লেখালেখির জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর লেখা নিয়মিতভাবে পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ঈশান থারুর নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সেখানে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন পোস্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল এবং সহকর্মীদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত থাকার আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর বাবা শশী থারুরের পরিচিতির কারণে বিষয়টি দ্রুত সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ছাঁটাই কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক কারণে নয়; এটি পুরোপুরি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
সাংবাদিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
ওয়াশিংটন পোস্টের এই ছাঁটাইয়ের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সমাজে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সংবাদমাধ্যমগুলো যদি এভাবে কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়, তাহলে ছোট ও আঞ্চলিক মিডিয়ার ভবিষ্যৎ কী?
সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, ব্যয় কমানোর নামে সাংবাদিকতার মান ও স্বাধীনতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তারা বিকল্প সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের চাকরি সুরক্ষিত থাকে।
ওয়াশিংটন পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান
প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তারা দাবি করেছে, ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং নতুন চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ভবিষ্যতে ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন মডেল আরও শক্তিশালী করা, নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কনটেন্ট ফরম্যাট চালু করা এবং পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বৈশ্বিক মিডিয়া সংকটের প্রতিফলন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটন পোস্টের এই ছাঁটাই বৈশ্বিক মিডিয়া শিল্পের চলমান সংকটেরই প্রতিফলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিন নির্ভর কনটেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমগুলো আয়ের বড় অংশ হারাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন প্রযুক্তি কিছু ক্ষেত্রে মানবসম্পদের প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছে।
তবে অনেকে মনে করেন, বিশ্বাসযোগ্য ও গভীর সাংবাদিকতার চাহিদা কখনোই পুরোপুরি কমে যাবে না। চ্যালেঞ্জ হলো—এই সাংবাদিকতাকে টেকসই ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়।
ওয়াশিংটন পোস্টের এই সিদ্ধান্ত আপাতত প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কৌশলকে নতুনভাবে সাজানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে চাকরি হারানো কর্মীদের জন্য এটি একটি কঠিন সময়। ঈশান থারুরসহ অনেক সাংবাদিকই নতুন প্ল্যাটফর্মে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মিডিয়া বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দিনগুলোতে আরও কিছু বড় সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের পুনর্গঠন দেখা যেতে পারে। ফলে সাংবাদিকতা পেশা যেমন রূপ বদলাচ্ছে, তেমনি সাংবাদিকদেরও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
#খবরডটকম
0 মন্তব্যসমূহ