এপস্টেইনকে গোপন তথ্য পাঠানোর অভিযোগে সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে পুলিশ তদন্ত শুরু

এখনকার প্রকাশিত তথ্য অনুসারে যুক্তরাজ্যের সাবেক মন্ত্রী ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন রাজনীতিবিদ পিটার ম্যান্ডেলসন-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন-কে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কিছু গোপন, সংবেদনশীল ও ‘মার্কেট-সেন্সিটিভ’ তথ্য পাঠিয়েছেন। এই তথ্যগুলি সরকারি কাগজপত্র, রাজকীয় নীতি ও এমনকি অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের পরিকল্পনার তথ্য অন্তর্ভুক্ত বলে বলা হচ্ছে।

এই বিষয়ে британ পুলিশ — specifically মেট্রোপলিটন পুলিশ — ইতোমধ্যেই একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে এবং দেখছে যে এই ধরনের তথ্য ফাঁস করা কি “misconduct in public office” — সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গুরুতর বেআইনি আচরণ — হিসেবে গণ্য হয় কি না।

পিটার ম্যান্ডেলসন

পিটার ম্যান্ডেলসন ব্রিটিশ রাজনীতির একজন প্রভাবশালী নেতা; দীর্ঘ সময় সাধারণ মন্ত্রীসহ বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের পদে থেকে তিনি যুক্তরাজ্যের কর প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

তবে তাঁর অনেকে মনে করেন তিনি শুধুমাত্র নীতিনির্ধারণকারী ও রাজনীতিকই নন, বরং একজন শীর্ষ পর্যায়ের কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু এই সম্পর্কই আজ তার জন্য পরিণতির কারণ হিসাবে সামনে এসেছে।

জেফ্রি এপস্টেইনকে কে?

জেফ্রি এপস্টেইন একজন মার্কিন অর্থবিজ্ঞানী ও যৌন অপরাধী, যিনি বহু বছর ধরে অসংখ্য নাবালিকা এবং তরুণ নারীদের যৌন পাচারের অপরাধে অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তিনি দীর্ঘ সময় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ছিলেন এবং ২০১৯ সালে তিনি জেলে মারা যান।

এপস্টেইন শুধু যৌন অপরাধেই অভিযুক্ত ছিলেন না; তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং বহু উচ্চপদস্থ ব্যক্তির ফোন নম্বর ও ইমেইল এড্রেস তাঁর নথিতে পাওয়া গেছে। এই ইমেইল ও কাগজপত্রের মধ্যেই ম্যান্ডেলসনের নামও এসেছে — যা বর্তমানে তদন্তের ভিত্তি।

বর্তমানে প্রকাশিত তথ্য ও ফাঁস হওয়া নথি থেকে জানা যায়:

  • ম্যান্ডেলসন গোপন সরকারি ইমেইল এবং নীতিগত তথ্য এপস্টেইনের কাছে পাঠিয়েছেন, এমন ইমেইলগুলো নথিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
  • যে তথ্যগুলো পাঠানো হয়েছে তা ছিল সরকারি নীতি, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা ও ‘মার্কেট-সেন্সিটিভ’ সরকারি সিদ্ধান্ত
  • এই তথ্যগুলো সরকারি নিরাপত্তা বিধি ও নিয়মের পরিপন্থী হতে পারে বলে পুলিশ তদন্ত করছে।
  • এছাড়া কিছু নথিতে ২০০০-এর প্রথম দিকে এপস্টেইনের পক্ষ থেকে ম্যান্ডেলসন বা তার ঘনিষ্ঠদের কাছে অর্থ প্রদান হওয়ার সন্দেহ দেখা গেছে, যদিও ম্যান্ডেলসন সে সম্পর্কে “আমি স্মরণ করতে পারি না” বলেছেন।

এই তথ্যগুলোতে উদ্বেগ রয়েছে যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকারি তথ্য কি ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা অন্যায়ভাবে অন্য কাউকে পাঠানো হয়েছে কি না — যা বিরাট বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের অবস্থান

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই ঘটনাকে “disgraceful” বা ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন সরকারি নিরাপত্তা নীতির প্রতি হতাশা ও উদ্বেগ রয়েছে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন তদন্তে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকা এবং যার যার দায়িত্বে সবাই সহযোগিতা করবে।

সরকার ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইমেইল ও নথি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে এবং মনে করছে এটি আদালতির দ্বারাই বিচার হওয়া উচিত। এছাড়া সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ, এমনকি ম্যান্ডেলসনের হাউস অফ লর্ডস থেকে পদহরণ ও সাধারণ জনগণের কাছ থেকে মুক্তি দেয়া বিষয়টিও সরকার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে।

আইনি প্রক্রিয়া

মেট্রোপলিটন পুলিশ ইতোমধ্যেই ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে এবং এখন তারা দেখছে যে ম্যান্ডেলসনের কাজ “misconduct in public office” হিসেবে বিচারযোগ্য কি না। এটি সরকারী দায়িত্বে থাকা অবস্থায় গুরুতর বেআইনি আচরণ হলে শাস্তি হিসেবে জীবনেও কারাদণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

এই ঘটনার ফলে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে:

  • লেবার পার্টি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এখন আত্মসমালোচনা করছে।

  • রাজনৈতিক নেতারা প্রশাসনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও এ ধরনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের প্রতি সরকারি দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছেন।

  • সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতিবিদ ও শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তাদের প্রতি আস্থা কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ মাত্র নয় — এটি একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক, আইনি ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের অংশ। এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ও সরকারি তথ্য ফাঁসের ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে সরকারী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও আন্তর্জাতিক নীতিতে বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে রেখে দিয়েছে।

এই ঘটনা ভবিষ্যতে কীভাবে শেষ হবে এবং পিটার ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে কি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে — তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটি ইতোমধ্যেই ব্রিটিশ রাজনীতিকে একটি উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের মধ্যে টেনে এনেছে। 

 #খবরডটকম

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ